ঢাকা শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১০ আশ্বিন ১৪৩৩ বাংলা

নড়াইলের পথে পথে ত্রিশ বছরের খবরবাহক স্বপন

প্রতিনিধির নাম
  • ১১:২১:৪৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২১ নভেম্বর ২০২৫
  • / 0

শরিফুজ্জামান, নড়াইল প্রতিনিধি

 

চিত্রা নদীর পাড়ে সূর্যোদয়ের রঙ ছড়ানোর আগেই গ্রাম থেকে সাইকেল চালিয়ে শহরে এসে থামেন স্বপন কুন্ডু (৫৭)। হাতিরবাগান বাসস্ট্যান্ডের মোড়ে দাঁড়িয়ে তাঁর প্রতীক্ষা—যশোরমুখী বাসটা কখন নামিয়ে দেবে দিনের পত্রিকার বান্ডেল। বান্ডেল হাতে পাওয়ার মুহূর্তেই স্বপনের চলনে যেন বদলে যায় এক আলাদা ছন্দ। চটপট রিল খুলে সাজিয়ে নেন বাইসাইকেলের সামনের ব্যাগ আর পেছনের ক্যারিয়ারে। তারপরই ভোরের আলোয় মিশে ছড়িয়ে পড়ে তাঁর ডাক—এই খবর আছে, খবর! আজকের তাজা খবর।

পথচারীরা কেউ এক কপি, কেউ দুই কপি কিনতে এগিয়ে আসেন। ব্যস্ততার সেই কয়েক মিনিট পেরোলেই স্বপনের সাইকেল ছুটে চলে শহরের রাস্তা-গলিপথে—দোকানপাট, বাসা-বাড়ি, অফিস–আদালত—সব জায়গায় খবর পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব তাঁরই।

গত বুধবার ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত তার সঙ্গে ঘুরে দেখা গেল নড়াইলের এই দীর্ঘদিনের পত্রিকা বাহকের প্রতিদিনের জীবন। তার বাড়ি সদর উপজেলার হাটবাড়িয়া গ্রামে। সেখান থেকে প্রতিদিন সাইকেল চালিয়ে নড়াইল শহরে এসে তিন দশক ধরে করে যাচ্ছেন এই পেশা। সংসারে স্ত্রী, এক ছেলে, এক মেয়ে আর বৃদ্ধ শাশুড়ি—সবাই চলে তাঁর উপার্জনে। বড় ছেলে মাস্টার্সে পড়েন, মেয়ে দ্বাদশ শ্রেণিতে।

স্মৃতি হাতড়ে স্বপন কুন্ডু বলেন, ‘‘যুবক বয়সে শূন্য হাতে বিয়া করিছিলাম। তখন আর্থিক অবস্থাও খুব খারাপ। এরিমধ্যি বাড়ির পাশের সাংবাদিক অশোক দাদা আর যশোরের লোকসমাজ পত্রিকার তখনকার ম্যানেজার বাদল ভাই পত্রিকা বিক্রির কথা বলে। তাঁদের কথামতোই শুরু করি এই পেশা। ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে এটাই করছি। এই পেশার আয়ে ঘর তুলছি, ছেলে-মেয়েরে পড়াচ্ছি—সবই এই পত্রিকার টাকায়।’’

দিনদিন কাগজের পাঠক কমে যাওয়ার আক্ষেপও আছে তাঁর কণ্ঠে। ‘‘১৫ কপি লোকসমাজ দিয়ে শুরু করছিলাম। একসময় ৪০০ কপি চালাইতাম। পরে লোকসমাজ কমলেও অন্য পত্রিকা বাড়ে। এখন নেটের যুগ আসায় পত্রিকার চাহিদা কমতেছে। তরুণেরা কাগজ পড়ে না। বয়স্করাই বেশি নেয়। এখন স্থানীয়-জাতীয় মিলিয়ে আড়াইশো কপি চালাই।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘একসময় ১৪–১৫ হাজার টাকা আয় হইত। তখন দ্রব্যমূল্যে দাম কম ছিল, সংসার চালাইয়াও কিছু সঞ্চয় হইত। এখন পত্রিকার চাহিদা কমায় আয়ও কমে গেছে। ১০–১২ হাজার টাকা পাই, তাও কষ্টে ধরে রাখা যায়। এই পেশায় নতুন কেউ আসে না। কিন্তু আমার এই কাজের প্রতি ভালোবাসা—ছাড়তেও পারি না।’’

রোদ-বৃষ্টি, ঝড়-ঝাপটা—কিছুতেই তাঁর পথচলা থামে না। নিজের জীবনের সবচেয়ে কঠিন দিনও থামাতে পারেনি দায়িত্ববোধ। ‘‘একদিন শহরে আইসা খবর পাই—আমার মা মারা গেছেন। সেই অবস্থায়ও কাইন্দা কাইন্দা গ্রাহকের কাছে পত্রিকা পৌঁছে দিছি। এভাবেই গ্রাহকরে ধরে রাখছি,’’ বলেন তিনি।

দীর্ঘদিনের এই নিষ্ঠার কারণে গ্রাহকদের আস্থাও তৈরি হয়েছে তাঁর প্রতি। সাহেব আলী নামে এক গ্রাহক বলেন, ‘‘স্বপন বাবু খুব ভালো সংবাদপত্র বাহক। বহু বছর ধরে তিনি দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকা সময়মতো পৌঁছে দেন। তাঁর জন্যই আমরা নিয়মিত খবর জানতে পারি।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

নড়াইলের পথে পথে ত্রিশ বছরের খবরবাহক স্বপন

১১:২১:৪৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২১ নভেম্বর ২০২৫

শরিফুজ্জামান, নড়াইল প্রতিনিধি

 

চিত্রা নদীর পাড়ে সূর্যোদয়ের রঙ ছড়ানোর আগেই গ্রাম থেকে সাইকেল চালিয়ে শহরে এসে থামেন স্বপন কুন্ডু (৫৭)। হাতিরবাগান বাসস্ট্যান্ডের মোড়ে দাঁড়িয়ে তাঁর প্রতীক্ষা—যশোরমুখী বাসটা কখন নামিয়ে দেবে দিনের পত্রিকার বান্ডেল। বান্ডেল হাতে পাওয়ার মুহূর্তেই স্বপনের চলনে যেন বদলে যায় এক আলাদা ছন্দ। চটপট রিল খুলে সাজিয়ে নেন বাইসাইকেলের সামনের ব্যাগ আর পেছনের ক্যারিয়ারে। তারপরই ভোরের আলোয় মিশে ছড়িয়ে পড়ে তাঁর ডাক—এই খবর আছে, খবর! আজকের তাজা খবর।

পথচারীরা কেউ এক কপি, কেউ দুই কপি কিনতে এগিয়ে আসেন। ব্যস্ততার সেই কয়েক মিনিট পেরোলেই স্বপনের সাইকেল ছুটে চলে শহরের রাস্তা-গলিপথে—দোকানপাট, বাসা-বাড়ি, অফিস–আদালত—সব জায়গায় খবর পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব তাঁরই।

গত বুধবার ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত তার সঙ্গে ঘুরে দেখা গেল নড়াইলের এই দীর্ঘদিনের পত্রিকা বাহকের প্রতিদিনের জীবন। তার বাড়ি সদর উপজেলার হাটবাড়িয়া গ্রামে। সেখান থেকে প্রতিদিন সাইকেল চালিয়ে নড়াইল শহরে এসে তিন দশক ধরে করে যাচ্ছেন এই পেশা। সংসারে স্ত্রী, এক ছেলে, এক মেয়ে আর বৃদ্ধ শাশুড়ি—সবাই চলে তাঁর উপার্জনে। বড় ছেলে মাস্টার্সে পড়েন, মেয়ে দ্বাদশ শ্রেণিতে।

স্মৃতি হাতড়ে স্বপন কুন্ডু বলেন, ‘‘যুবক বয়সে শূন্য হাতে বিয়া করিছিলাম। তখন আর্থিক অবস্থাও খুব খারাপ। এরিমধ্যি বাড়ির পাশের সাংবাদিক অশোক দাদা আর যশোরের লোকসমাজ পত্রিকার তখনকার ম্যানেজার বাদল ভাই পত্রিকা বিক্রির কথা বলে। তাঁদের কথামতোই শুরু করি এই পেশা। ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে এটাই করছি। এই পেশার আয়ে ঘর তুলছি, ছেলে-মেয়েরে পড়াচ্ছি—সবই এই পত্রিকার টাকায়।’’

দিনদিন কাগজের পাঠক কমে যাওয়ার আক্ষেপও আছে তাঁর কণ্ঠে। ‘‘১৫ কপি লোকসমাজ দিয়ে শুরু করছিলাম। একসময় ৪০০ কপি চালাইতাম। পরে লোকসমাজ কমলেও অন্য পত্রিকা বাড়ে। এখন নেটের যুগ আসায় পত্রিকার চাহিদা কমতেছে। তরুণেরা কাগজ পড়ে না। বয়স্করাই বেশি নেয়। এখন স্থানীয়-জাতীয় মিলিয়ে আড়াইশো কপি চালাই।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘একসময় ১৪–১৫ হাজার টাকা আয় হইত। তখন দ্রব্যমূল্যে দাম কম ছিল, সংসার চালাইয়াও কিছু সঞ্চয় হইত। এখন পত্রিকার চাহিদা কমায় আয়ও কমে গেছে। ১০–১২ হাজার টাকা পাই, তাও কষ্টে ধরে রাখা যায়। এই পেশায় নতুন কেউ আসে না। কিন্তু আমার এই কাজের প্রতি ভালোবাসা—ছাড়তেও পারি না।’’

রোদ-বৃষ্টি, ঝড়-ঝাপটা—কিছুতেই তাঁর পথচলা থামে না। নিজের জীবনের সবচেয়ে কঠিন দিনও থামাতে পারেনি দায়িত্ববোধ। ‘‘একদিন শহরে আইসা খবর পাই—আমার মা মারা গেছেন। সেই অবস্থায়ও কাইন্দা কাইন্দা গ্রাহকের কাছে পত্রিকা পৌঁছে দিছি। এভাবেই গ্রাহকরে ধরে রাখছি,’’ বলেন তিনি।

দীর্ঘদিনের এই নিষ্ঠার কারণে গ্রাহকদের আস্থাও তৈরি হয়েছে তাঁর প্রতি। সাহেব আলী নামে এক গ্রাহক বলেন, ‘‘স্বপন বাবু খুব ভালো সংবাদপত্র বাহক। বহু বছর ধরে তিনি দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকা সময়মতো পৌঁছে দেন। তাঁর জন্যই আমরা নিয়মিত খবর জানতে পারি।