কালের বিবর্তন ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় বিলুপ্তির পথে গ্রামীণ নরসুন্দর পেশা
- ০২:৫২:২৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ মে ২০২৫
- / 2

মোঃ মনিরুজ্জামান জাহিদ,বিশেষ প্রতিনিধি,বগুড়া
বাংলার গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী পেশাগুলোর মধ্যে নরসুন্দর পেশা একসময় ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানজনক। হাট-বাজার কিংবা পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা নরসুন্দররাই ছিলেন গ্রামের মানুষের চুল-দাড়ির সৌন্দর্যচর্চার একমাত্র ভরসা। তাঁরা শুধু একজন চুল কাটিয়ে ছিলেন না, ছিলেন গ্রামের মানুষের আড্ডার সাথী, সামাজিক বার্তাবাহক এবং উৎসব-পার্বণের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, কালের পরিক্রমা ও আধুনিকতার প্রবাহে আজ এই পেশাটি অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে।
সারিয়াকান্দি উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, আগে যেখানে প্রতি গ্রামে একাধিক নরসুন্দর ছিল, সেখানে এখন গোনা কয়েকজনই কোনোভাবে টিকে আছেন। নতুন প্রজন্ম এই পেশায় আগ্রহ হারিয়েছে। কারণ, আধুনিক স্টাইল ও ব্র্যান্ডেড সেলুনের চাপে তাঁরা হয়ে পড়েছেন প্রায় অপ্রাসঙ্গিক। শহরের মতো এখন গ্রামের তরুণরাও আধুনিক পার্লার ও সেলুনে গিয়ে নতুন স্টাইলে চুল কাটতে আগ্রহী। এ প্রবণতায় প্রচলিত গ্রামীণ নরসুন্দরদের আয় কমে গেছে, আর্থিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।এই পেশার সঙ্গে জড়িত প্রবীণরা বলছেন, আগে যেখানে দিনে ২০-৩০ জন গ্রাহক আসতেন, এখন সেখানে ৫-৭ জনও পাওয়া মুশকিল। আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষণের অভাব, মূলধনের সংকট এবং সমাজে অবমূল্যায়নের কারণে এই পেশা আজ অবহেলিত। বহু পুরনো নরসুন্দর এখন অন্য পেশায় চলে গেছেন—কেউ কৃষিকাজে, কেউবা দিনমজুরি বা ভ্যানে করে পণ্য বিক্রিতে।
তবে সমস্যা সত্ত্বেও আশার আলো দেখছেন অনেকে। যদি সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এই পেশাকে রক্ষা ও উন্নয়নের জন্য এগিয়ে আসে—কম খরচে প্রশিক্ষণ, ঋণ সুবিধা ও আধুনিক যন্ত্রপাতির সরবরাহ নিশ্চিত করে—তবে এই ঐতিহ্যবাহী পেশা আবারও পুনরুজ্জীবিত হতে পারে। কমিউনিটি-ভিত্তিক সেলুন গঠন, ন্যায্য পারিশ্রমিক নির্ধারণ এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে নরসুন্দরদের সম্মান ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
নরসুন্দররা শুধুমাত্র চুল কাটেন না, তাঁরা গ্রামীণ সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বাহক। তাঁদের হারিয়ে যাওয়ার অর্থ—একটি সংস্কৃতির ধ্বংস। তাই এখনই সময় ঐতিহ্যকে রক্ষা করার, সমাজের সকল স্তরের মানুষকে সচেতন হওয়ার এবং এই পেশার পুনরুদ্ধারে উদ্যোগ নেওয়ার।
একটি জাতি তার শেকড় ভুলে গেলে ভবিষ্যৎ পথচলা দুরূহ হয়ে পড়ে। গ্রামীণ নরসুন্দর পেশার মতো ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখাই হবে প্রকৃত উন্নয়নের প্রতীক।




















