তেঁতুলিয়ায় সারের হাহাকার, কৃষি বিভাগের ভিন্ন সুর
- ১২:১২:২২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 10
কৃষকের আমনের আবাদ এবং বাস্তবতা
কাগজে-কলমে সার সংকট নেই। কিন্তু মাঠের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। আমন ধান ও আগাম শীতকালীন সবজি চাষের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রয়োজনীয় সার না পেয়ে তেঁতুলিয়া দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। দিনের পর দিন ডিলার ও খুচরা বিক্রেতার দোকানে ঘুরেও মিলছে না চাহিদামতো ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও পটাশ। কেউ সার না পেয়েই জমিতে চারা রোপণ করছেন আমন ধান আবার কেউ বাড়তি দাম দিয়েও প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহ করতে পারছেন না।
সোমরাব দুপুরে তেঁতুলিয়া উপজেলার তিরনই হাট ইউনিয়নের কৃষকের এমন ভোগান্তির চিত্র দেখা যায়। বাস্তব চিত্র কোথাও সার নেই।
তিরনই হাট যুগিগছ গ্রামের কৃষক মোঃ মোস্তফা ও মুজাম্মেল, মোকলেছুর রহমান জমিতে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে সারের জন্য ডিলারের কাছে ধরনা দিয়েছেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় সার না পেয়ে শেষ পর্যন্ত তেঁতুলিয়া কৃষি অফিসে আসেন তিনি। এবং এ প্রতিবেদকের কাছে কথা বলেন পরে তাদের কৃষি অফিসে যোগাযোগব্যবস্থা করে দেন।
ক্ষোভের সঙ্গে মুজাম্মেল হক বলেন, ‘অন্তত কিছু টিএসপি সার দিতে পারলেও ভালো হতো। পরে যদি পাওয়া যায়, সেই আশা নিয়েই আবাদ করছি।’
শুধু তেঁতুলিয়া যুগিগছ গ্রামের কৃষক মোঃ মোস্তফাজ্জামান নন, একই এলাকার শত শত সবজি ও আমন চাষি সারের জন্য ছুটছেন ডিলার ও খুচরা বিক্রেতার দোকানে। কৃষকের অভিযোগ, প্রয়োজনের সময় সার না পাওয়ায় চাষাবাদ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
তেতুলিয়ার কৃষক মোকলেছুর রহমান বলেন, ‘এক একর জমিতে আমান
লাগানোর আগে টিএসপি, পটাশ ও ডিএপি সার দরকার। কয়েক দিন ধরে চেষ্টা করেও প্রয়োজনীয় সার জোগাড় করতে পারছি না।’
তেতুলিয়া এলাকার খুচরা সার বিক্রেতা আব্দুল রাজ্জাক দোকানে গিয়ে দেখা যায়, আমনের জন্য ইউরিয়া এবং কপি ক্ষেতে ব্যবহারের জন্য টিএসপি ও পটাশ সার নিতে ভিড় করেছেন কৃষকরা। কিন্তু চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় অনেককেই সার না পেয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে।
কৃষক হাসান আলী বলেন, ‘তিন দিন ধরে সারের দোকানে ঘুরছি। প্রতি কেজিতে দুই-তিন টাকা বেশি দিয়েও কিনতে রাজি আছি। কিন্তু সারই পাওয়া যাচ্ছে না।’
আরেক কৃষক জানান, এক একর আমন জমিতে তার অন্তত ৩০ কেজি ইউরিয়া সার প্রয়োজন। কিন্তু চার দিন ঘুরে মাত্র ১০ কেজি ইউরিয়া সার সংগ্রহ করতে পেরেছেন তিনি।
খুচরা সার বিক্রেতা নাছির, মুক্তার হোসেন
বলেন, ‘এলাকার ডিলারের কাছে সার মিলছে না। সারের জন্যে প্রতিনিয়ত কৃষকের হাহাকার। মাঠে আমনের ধান হলুদ বর্ণ ধারণ করেছে।
বাংলাবান্ধা, তিরনই হাট, তেঁতুলিয়া ইউনিয়নের রাসায়নিক সার ডিলার
মেসার্স সাকিব ট্রেডার্স দোকানেও সকালে কৃষকদের ভিড় দেখা যায়। কেউ কৃষি কার্ড, কেউ জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে সার সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। তবে অনেকেই ব্যর্থ হয়ে বাড়ি ফিরছেন।
ডিলার জানান, চলতি মাসে তার নামে ৪৫ মেট্রিক টন সার বরাদ্দ রয়েছে। এর মধ্যে মাস শুরুর আগেই গত আগস্ট সেপ্টেম্বর কৃষি কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে ১৮ মেট্রিক টন সার উত্তোলন করে বিতরণ করা হয়েছে।
কৃষকরা জানান, তেঁতুলিয়া ইউনিয়ন অন্যতম সবজিপ্রধান এলাকা। বিশেষ করে শারিয়াল জোত
গ্রামে প্রায় ৩০ বছর ধরে আগাম কপি চাষ হয়ে আসছে। গ্রামের প্রায় এক হাজার পরিবারের মধ্যে অন্তত ৭০০ পরিবার কপি চাষের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু চলতি মৌসুমে প্রয়োজনের সময় সার না পাওয়ায় তাদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে।
কৃষকদের ভাষ্য, শুধু সার না পাওয়াই নয়, কোথাও কোথাও বাড়তি দাম দিয়েও সার মিলছে না। ফলে সময়মতো জমিতে সার প্রয়োগ করতে না পারলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বাড়তে পারে চাষের খরচ।
এদিকে কৃষি বিভাগ বলছে, জেলায় কোনো সার সংকট নেই। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি আমন মৌসুমে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ৬৫০ হেক্টর জমিতে আগাম শীতকালীন সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে জেলায় ইউরিয়া সারের অনুমোদিত বরাদ্দ পেয়েছে। পঞ্চগড় বিসিআইসি সার গুদামের তথ্য অনুযায়ী, মহানন্দা ট্রেডার্স ১১৭ মেট্রিক টনের বিপরীতে ৯৮ টন, আকিব এন্টারপ্রাইজ ১১৯ টনের বিপরীতে ৮০ টন, পিয়াশা এন্টারপ্রাইজ ১১৯ টনের বিপরীতে ১১২ টন এবং কেশব ট্রেডার্স ১১৭ মেট্রিক টনের বিপরীতে ৯৪ মেট্রিক টন সার , নুরজাহান এন্টারপ্রাইজ ৯৭ টন এবং মেসার্স রুম্পা এন্টারপ্রাইজ ১০৯ মেট্রিক টন সার, মেসার্স সাকিব ট্রেডার্স তাদের বরাদ্দকৃত ১১৯ মেট্রিক টন সারই উত্তোলন করেছে বলে দেখানো হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ আব্দুল মতিন বলেন, ‘জেলায় কোনো সারের সংকট নেই। কৃষি কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে সমস্যা সমাধানে কাজ করছেন। ফলে এখন কোথাও কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়।’
তবে তেতুলিয়া মাঠের চিত্র এবং কৃষকদের বক্তব্যে দেখা যাচ্ছে, কৃষি বিভাগের ‘সার সংকট নেই’ দাবির সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক রয়েছে। কৃষকদের দাবি, বরাদ্দ ও সরবরাহের হিসাব যাই থাকুক, প্রয়োজনের সময় ডিলারের দোকানে সার না পেলে সেই হিসাব তাদের কোনো কাজে আসছে না।
তাদের আশঙ্কা, দ্রুত চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে আমন ও আগাম শীতকালীন সবজি চাষে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।



















