আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী তামা শিল্প
- ০৯:২৬:৩৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২ মার্চ ২০২৫
- / 0

মোঃ মনিরুজ্জামান জাহিদ বিশেষ প্রতিনিধি
প্রযুক্তির অগ্রগতি ও আধুনিকতার বিস্তারে আমাদের ঐতিহ্যবাহী অনেক শিল্পই বিলুপ্তির পথে। তেমনই একটি শিল্প হলো তামার শিল্প, যা একসময় বাংলার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। একসময় ঘরবাড়ি, মন্দির-মসজিদ, রাজবাড়ি ও সাধারণ গৃহস্থালিতে তামার তৈজসপত্রের ব্যাপক ব্যবহার ছিল। কিন্তু বর্তমানে এই শিল্প কালের বিবর্তনে বিলুপ্তির মুখে পড়ছে।
বাংলাদেশে তামার শিল্পের ইতিহাস বহু শতাব্দী পুরোনো। এক সময় রাজা-বাদশাহদের দরবার থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের রান্নাঘরেও তামার বাসন-কোসন ছিল অপরিহার্য। তামা দিয়ে তৈরি হুক্কা, পানির কলসি, ঘটি-বাটি, ঠান্ডা পানি রাখার ঘড়া, বাসন-পত্র, পিতলের মূর্তি—সবই ছিল বাংলার সংস্কৃতির অংশ। বিশেষ করে, পিতল ও তামার কাজের জন্য বিখ্যাত ছিল কুমারপাড়া, ধূপখোলা, বংশাল, পাবনা, রাজশাহী, কুমিল্লা ও নারায়ণগঞ্জের মতো অঞ্চলগুলো।
তামা শিল্পের বিলুপ্তির পেছনে প্রধান কারণ হলো প্লাস্টিক ও স্টেইনলেস স্টিলের সহজলভ্যতা। আধুনিক যুগে অ্যালুমিনিয়াম ও মেলামাইনের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় তামার জিনিসপত্রের চাহিদা কমে গেছে। এছাড়া, উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় অনেক কারিগর অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
একসময় বাংলাদেশে প্রচুর তামা ও পিতল গলিয়ে বিভিন্ন পণ্য তৈরি হতো। কিন্তু বর্তমানে কাঁচামালের অভাব এবং উচ্চমূল্যের কারণে তামার পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। ফলে সাধারণ মানুষ এখন আর এগুলো ব্যবহার করতে চায় না। শুধু তাই নয়, তামার জিনিসপত্র তৈরির কারিগরদের পরবর্তী প্রজন্ম আর এই পেশায় আসতে চাইছে না। তারা আধুনিক পেশার দিকে ঝুঁকছে, যার ফলে তামা শিল্প ক্রমেই বিলুপ্তির পথে।
পিন্টু মিয়া নামে এক কারিগর গণমাধ্যম কর্মীকে বলেন আমরা বগুড়া থেকে বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে বিভিন্ন রকম তামা তৈজসপত্র তৈরি করে থাকি কিন্তু আমাদের এই কাজ শুধু এক শিল্প নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতির অংশ। কিন্তু আজ কাঁচা মালের দাম এত বেশি যে কাজ চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। আমরা পণ্যের গুণগত মান বজায় রাখতে চাই, কিন্তু যথার্থ কাঁচামাল পাওয়া যাচ্ছে না।
তামার শিল্পকে বাঁচাতে হলে কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকারের উচিত এ শিল্পের কারিগরদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ ও ঋণ সুবিধা দেওয়া। পাশাপাশি, তামার তৈরি পণ্যগুলোর বাজার সম্প্রসারণের জন্য অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা যেতে পারে। বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হলে তামার শিল্প আবারও জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, “সরকারি নীতি, সহজ ঋণ সুবিধা এবং স্থানীয় কাঁচামাল উৎপাদনে গুরুত্ব দিলে হয়তো এই শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব হবে। শিল্পের ঐতিহ্য বজায় রাখতে হলে শুধু কারিগরদের প্রচেষ্টাই যথেষ্ট নয়, বরং একটি সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
তামার শিল্প কেবল একটি ব্যবসা নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতির অংশ। এটি রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। যদি আমরা এখনই এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখার উদ্যোগ না নেই, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শুধুমাত্র বইয়ের পাতায় এই ঐতিহ্যের কথা জানতে পারবে। আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কিভাবে ঐতিহ্য ধরে রাখা যায়, সেটাই আমাদের ভাবার সময় এসেছে।




















