ঈদুল আযহা ঘিরে জমজমাট সারিয়াকান্দির লোহা শিল্প: ছুরি-দা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা
- ১১:৫৩:৩৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩১ মে ২০২৫
- / 1

মোঃমনিরুজ্জামান বিশেষ প্রতিনিধি
পবিত্র ঈদুল আযহা সামনে আসতেই বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে কামারপল্লীগুলোয় নেমে এসেছে ব্যস্ততার ভিন্ন এক আমেজ। চারদিকে ঠুং ঠাং শব্দে মুখর কর্মশালা, লোহার পাত গলছে আগুনের উত্তাপে, আর দক্ষ কারিগরের হাতুড়ির ঘায়ে রূপ নিচ্ছে ধারালো ছুরি, দা, বঁটি ও চাপাতি।
কোরবানির পশু জবাই ও মাংস প্রস্তুতের জন্য প্রয়োজনীয় এসব সরঞ্জাম তৈরিতে দিন-রাত এক করে কাজ করছেন কামাররা। সারিয়াকান্দির বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য কামার পরিবার, যারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই ঐতিহ্যবাহী লোহা শিল্পকে টিকিয়ে রেখেছেন। বছরের অন্য সময়ের তুলনায় ঈদুল আযহা মৌসুমই তাদের জন্য সবচেয়ে ব্যস্ততম এবং লাভজনক।
কারিগর মহন কর্মকার বলেন, “ঈদের এক মাস আগে থেকেই কাজের চাপ বাড়ে। তবে ঈদের ১০-১৫ দিন আগে তো কাজের ভিড়ে দম ফেলারও সময় মেলে না। সকাল থেকে রাত গভীর পর্যন্ত কাজ করেও সব অর্ডার সময়মতো ডেলিভারি দিতে হিমশিম খেতে হয়।” তিনি জানান, সাধারণ সময়ে দিনে ৫-১০টি দা বা ছুরি তৈরি করলেও, ঈদের সময় সেটি বেড়ে দাঁড়ায় ২০-২৫টিতে।
সারিয়াকান্দি ছাড়াও আশপাশের ধুনট, শেরপুর, গাবতলী ও সোনাতলার ক্রেতারাও প্রতিনিয়ত আসছেন এখানকার কামারপল্লীতে। সদরের বাজার ঘুরে দেখা যায়, দোকানের সামনে সারি সারি ছুরি, চাপাতি, দা ও বঁটি ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। আকার ও ওজন অনুযায়ী প্রতিটির দামও ভিন্ন। ছুরি বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ১৫০ টাকায়, দা ২০০ থেকে ৪৫০ টাকায় এবং বঁটি ২৫০ থেকে ৫০০ টাকায়। চাহিদা বুঝে অনেক কারিগর আবার কাস্টম ডিজাইনেও সরঞ্জাম তৈরি করছেন।
কারিগর কালু চন্দ্র কর্মকার বলেন, “আমাদের তৈরি দা-ছুরি মজবুত ও ধারালো হওয়ায় ক্রেতারা বারবার ফিরে আসেন। ঈদের সময় যা আয় হয়, তা দিয়েই অনেকটা বছর চালিয়ে নেওয়া যায়। এ কারণেই এই সময়টা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
তবে ব্যয়ের দিক দিয়ে চিত্রটা কিছুটা ভিন্ন। কারিগররা জানান, লোহার পাত, কাঠের হাতল, কয়লা ও অন্যান্য উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ। এতে লাভ কমে গেছে বলে জানান অনেকেই। কারিগরদের মতে, যদি সরকার প্রশিক্ষণ এবং স্বল্পসুদের ঋণের ব্যবস্থা করতো, তাহলে আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে আরও উন্নতমানের ও অধিক পরিমাণে পণ্য উৎপাদন সম্ভব হতো।
মহন কর্মকার বলেন, “আমাদের পূর্বপুরুষরাও এই পেশায় ছিলেন। আমরাও করছি। কিন্তু এখনকার তরুণরা আগ্রহ হারাচ্ছে। কারণ, কষ্ট অনেক, আয় তুলনামূলক কম। সরকারি সহায়তা পেলে হয়তো এই পেশা আবার মর্যাদা ফিরে পাবে।”
ঈদুল আযহা ঘিরে সারিয়াকান্দির কামারপল্লীগুলো যেন ক্ষুদ্র শিল্পাঞ্চলে পরিণত হয়েছে। পরিবারভিত্তিক এই শিল্পে জড়িত হাজারো মানুষ, যাদের প্রধান জীবিকার উৎস এই দা-ছুরি-বঁটি তৈরি। কেউ কেউ ছোট ওয়ার্কশপ গড়েছেন, আবার কেউ এখনো হাতে তৈরি প্রক্রিয়ায় কাজ করছেন। সারিয়াকান্দির এই শিল্প শুধু স্থানীয় জীবিকার উৎস নয়, বরং এটি বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তাই সময় এসেছে এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে প্রশিক্ষণ, প্রণোদনা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের। আসন্ন কোরবানির ঈদ যেমন কামারদের ব্যস্ততা বাড়িয়েছে, তেমনি তাদের মুখে এনে দিয়েছে সাময়িক হাসি। তবে এই হাসিকে দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে প্রয়োজন সুসংগঠিত উদ্যোগ ও কার্যকর সহায়তা।




















