মনিরুজ্জামান জাহিদ বিশেষ প্রতিনিধি
আধুনিকতার ছোঁয়া ও প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে আমাদের সমাজে অনেক ঐতিহ্যবাহী পেশা বিলুপ্তির পথে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে গ্রামীণ নরসুন্দরদের পেশা। এক সময় গ্রামীণ হাট-বাজারে নরসুন্দররা দক্ষ হাতে চুল কাটতেন, দাড়ি কামাতেন এবং গ্রামের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতেন। তাঁরা শুধু নরসুন্দরই ছিলেন না, বরং অনেক সময় গ্রামীণ আড্ডার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতেন।
কালের পরিক্রমায় পরিবর্তন এসেছে মানুষের জীবনধারায়। বিশেষ করে শহরাঞ্চলের মতো গ্রামাঞ্চলেও সেলুন সংস্কৃতি ও আধুনিক স্টাইলিস্ট পার্লার জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। তরুণ প্রজন্ম এখন ব্র্যান্ডেড সেলুনের দিকে ঝুঁকছে, যেখানে আধুনিক সরঞ্জাম ও নতুন স্টাইলের চুল কাটার সুযোগ বেশি থাকে। এর ফলে ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ নরসুন্দরদের গুরুত্ব দিন দিন কমে যাচ্ছে।
একসময় গ্রামের হাটে বসে নরসুন্দররা তাঁদের সরঞ্জাম নিয়ে অপেক্ষা করতেন, গ্রামের কৃষক, শ্রমিক, সাধারণ মানুষ তাঁদের কাছে এসে চুল কাটাতেন বা দাড়ি কামাতেন। সেসব দৃশ্য এখন অনেকটাই কমে গেছে। বর্তমানে সারিয়াকান্দি, বগুড়া, নাটোরসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন গ্রামীণ এলাকায় নরসুন্দরদের সংখ্যা কমে আসছে।
আধুনিক সেলুন ও পার্লারের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা গ্রামীণ নরসুন্দরদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রযুক্তির অভাব, আধুনিক প্রশিক্ষণ না পাওয়া, আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও সামাজিক পরিবর্তনের কারণে তাঁদের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন, কেউ কেউ কৃষিকাজ কিংবা দিনমজুরের কাজ বেছে নিচ্ছেন।
তবে, যদি স্থানীয় প্রশাসন ও সমাজ উদ্যোগ নেয়, তাহলে নরসুন্দরদের এই পেশা রক্ষা করা সম্ভব। সরকার বা স্থানীয় সংগঠনগুলো যদি তাঁদের প্রশিক্ষণ দেয়, আধুনিক সরঞ্জাম কেনার সুযোগ করে দেয়, তাহলে তাঁরা নতুনভাবে প্রতিযোগিতায় ফিরতে পারেন। এছাড়া, স্থানীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে, যাতে এই পেশা হারিয়ে না যায়।
বিশেষ করে, যদি কিছু সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা আসে, তাহলে নরসুন্দররা তাঁদের পেশাকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারবেন। যেমন, কমিউনিটি ভিত্তিক সেলুন স্থাপন, স্বল্পমূল্যে ঋণ সুবিধা প্রদান, আধুনিক হেয়ার কাটিং প্রশিক্ষণ দেওয়া, ইত্যাদি উদ্যোগ তাঁদের অবস্থান দৃঢ় করতে সাহায্য করতে পারে।
তবে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য রক্ষার দায়িত্ব শুধু প্রশাসনের নয়, বরং সমাজের প্রতিটি স্তরের। আমরা যদি সচেতনভাবে তাঁদের প্রতি সহানুভূতিশীল হই, তাঁদের সেবা গ্রহণ করি, তাহলে তাঁরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারবেন।
নরসুন্দরদের কেবল পেশাজীবী হিসেবে না দেখে, তাঁদের সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হিসেবে মূল্যায়ন করা উচিত। তাঁদের অবদান স্বীকৃতি দিলে এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার সুযোগ দিলে, তাঁরা আবারও তাঁদের পেশায় সাফল্য অর্জন করতে পারবেন।
আমাদের উচিত এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখা, যাতে আগামী প্রজন্ম গ্রামীণ সংস্কৃতির এই দিকটি হারিয়ে না ফেলে।
চেয়ারম্যান: নাজমুল হক ভূইয়া
সম্পাদক: মোঃ গোলাম রাব্বানী, প্রকাশক: শাহীনুর আক্তার
সম্পাদকীয় বার্তা কার্যালয়:
৬৫৭, হাজী সলিমুল্লাহ রোড, নামা শ্যামপুর,
ফরিদাবাদ, কদমতলী, ঢাকা-১২০৪।
স্বত্ব © ২০২৬ লোকালয় বার্তা