
ঢাকা বিভাগীয় প্রতিনিধি
সুদানে গণহত্যা বিভীষিকাময় ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় গণহত্যার খবরটি তেমন একটা গুরুত্ব পাচ্ছে না। আমাদের দেশের জাতীয় মিডিয়াগুলো প্রায় নিশ্চুপ রয়েছে।
জাতিসংঘের বিবৃতি দায়সারা গোছের।
বিশেষ একটা গোষ্ঠীর মানবতা হচ্ছে ‘এক চোখা মানবতা’। ভিন্ন সম্প্রদায় দ্বারা নিজ সম্প্রদায়ের কেউ নির্যাতন, দমন-পীড়নের শিকার হলে এই গোষ্ঠীর ‘মানবতা’ তখন চাঙ্গা হয়ে ওঠে। কিন্তু নিজ সম্প্রদায় দ্বারা হত্যাকাণ্ড হলেও এদের ‘মানবতা’ থাকে তলানিতে!অমানবিকতার নির্মম রূপ এরাই উন্মোচন করে।
আফ্রিকার দেশ সুদান আজ এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে আছে। গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে আর এস এফ (র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্স ) এবং সরকারি সেনাবাহিনীর মধ্যে গৃহযুদ্ধ চলছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী–
১৫০০০০ এর বেশি মানুষ নিহত,১ কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত,
৪৫ লাখ শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে,আর অনেক শহরে রাস্তায় পড়ে আছে শত শত লাশ, যাদের দাফনেরও কেউ নেই। গণ কবরের ও ব্যবস্থা নাই।
গত তিনদিনে ১৫০০ জনকে হত্যা করা হয়েছে। তবুও, এই নির্মম বাস্তবতায় বাংলাদেশের সেই বিশেষ গোষ্ঠী নীরব!
যেখানে ইসরায়েল বা ভারত জড়িত থাকে, সেখানে এদের মানবতা যেন হঠাৎ জেগে ওঠে। তখন বিক্ষোভ হয়, মিছিল হয়, বিবৃতি আসে, “উম্মাহ” এক হয়। কিন্তু যখন হত্যাকারী কোনো মুসলিম গোষ্ঠী, বা ঘটনাস্থল কোনো আরব বা আফ্রিকান দেশ তখন মানবতা থাকে তলানিতে।
সুদানের যুদ্ধ মূলত দুই মুসলিম জেনারেলের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। কোনো ইহুদি নেই, কোনো নাসারা নেই, কোনো হিন্দু নেই। তাই বায়তুল মোকাররমের সামনে কোনো বিক্ষোভ নেই, কোন রাজনৈতিক ও ধর্মভিত্তিক দলগুলোর বিবৃতি নেই, মিডিয়ায় কোন টকশোয়ে আলোচনা বা প্রসঙ্গ নাই।
এই বিশেষ গোষ্ঠীর ‘মানবতা’ মানব নয়, বরং বিরোধী কারা তার উপর নির্ভরশীল। যদি হত্যাকারী হয় ইসরায়েল বা ভারত, তাহলে প্রতিবাদ ‘ফরজ’। কিন্তু যদি হত্যাকারী হয় মুসলিম মুসলিম কর্তৃক মুসলিম তাহলে “ওটা তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়”
আমাদের সমাজে ‘মানবতা’ বলতে মূলত বোঝায় ধর্মীয় আবেগের প্রতিক্রিয়া। ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে জনগণের রক্তগরম হয়, কারণ সেখানে ধর্মীয় পরিচয়ের সংঘাত আছে। কিন্তু সুদান, ইয়েমেন, সিরিয়া, লিবিয়া – এই দেশগুলোতেও মুসলমানেরা মুসলমানদের হত্যা করছে। এগুলো মানবতার পরিধির বাইরে পড়ে যায়।
মানবতার দাবি যদি সত্যিই করতে হয়, তাহলে সেটা হতে হবে অবাধ, নিরপেক্ষ ও সর্বজনীন। সুদানে লাশ মানে শুধু আফ্রিকান লাশ নয়, সেটা মানবতার লাশও। যে সমাজ অন্যের মৃত্যুকে ‘অপ্রাসঙ্গিক’ ভাবে, সেই সমাজ নিজের মৃত্যুকেও একদিন তুচ্ছ বানিয়ে ফেলে।
সুদানের রাস্তায় পড়ে থাকা লাশ শুধু আফ্রিকার নয়, সেটা আমাদের বিবেকেরও লাশ। আমরা যদি মানবতাকে ধর্মীয় বা রাজনৈতিক চশমায় দেখি, তাহলে আমাদের মানবতা একদিন কাগজে লেখা শব্দ হয়ে যাবে।

