প্রিন্ট এর তারিখঃ জুলাই ৭, ২০২৬, ১:৩৮ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ এপ্রিল ১২, ২০২৬, ৪:৩৪ অপরাহ্ণ
মুম্বাই, ১২ এপ্রিল ২০২৬ ভারতীয় সঙ্গীতের আকাশ থেকে খসে পড়ল এক উজ্জ্বলতম নক্ষত্র। কিংবদন্তি প্লেব্যাক গায়িকা আশা ভোঁসলে শনিবার রাতে মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। তাঁর প্রয়াণে স্তব্ধ গোটা উপমহাদেশ। ৮ দশক ধরে যে কণ্ঠ কোটি হৃদয়ে স্পন্দন তুলেছে, আজ সেই কণ্ঠ চিরতরে থেমে গেল।
*জন্ম ও পরিবার: সুরের ঘরে বেড়ে ওঠা*
আশা ভোঁসলের জন্ম ৮ সেপ্টেম্বর ১৯৩৩ সালে, মহারাষ্ট্রের সাংলিতে। জন্মনাম আশা মঙ্গেশকর। বাবা ছিলেন প্রখ্যাত নাট্যশিল্পী ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতজ্ঞ পণ্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকর। মা শেবন্তী মঙ্গেশকর ছিলেন গৃহিণী, কিন্তু সঙ্গীতের আবহেই সংসার গড়েছিলেন। দীননাথ মঙ্গেশকর মারাঠি থিয়েটারের কিংবদন্তি এবং গোয়ালিয়র ঘরানার শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পী ছিলেন। তাঁর হাত ধরেই মঙ্গেশকর পরিবারের পাঁচ ভাইবোনের সঙ্গীতে হাতেখড়ি।
বাবা দীননাথের অকাল প্রয়াণে মাত্র ৯ বছর বয়সে পিতৃহারা হন আশা। তারপর থেকেই বড় দিদি লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সংসারের হাল ধরেন।
*সঙ্গীতের পরিবার: মঙ্গেশকর খানদান*
মঙ্গেশকর পরিবার ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে এক বিরল অধ্যায়।
- *লতা মঙ্গেশকর*: বড় দিদি, ‘ভারতের নাইটিঙ্গেল’। ভারতরত্ন সম্মানপ্রাপ্ত।
- *ঊষা মঙ্গেশকর*: ছোট বোন, প্লেব্যাক ও ভক্তিগীতির জনপ্রিয় শিল্পী।
- *মীনা খাদিকর*: বোন, মারাঠি ও হিন্দি গানের শিল্পী।
- *হৃদয়নাথ মঙ্গেশকর*: একমাত্র ভাই, প্রখ্যাত সুরকার ও গায়ক।
এই পরিবার থেকে ভারত পেয়েছে শাস্ত্রীয়, ভজন, গজল, ভাবসঙ্গীত থেকে শুরু করে আধুনিক প্লেব্যাক— সব ঘরানার দিকপাল।
*সঙ্গীত জীবন: ১২ হাজারের বেশি গানের সম্রাজ্ঞী*
১৯৪৩ সালে মারাঠি ছবি _মাঝা বাল_ দিয়ে মাত্র ১০ বছর বয়সে প্লেব্যাক শুরু। হিন্দিতে প্রথম গান ১৯৪৮-এ _চুনরিয়া_ ছবিতে।
৫০-এর দশকে ও. পি. নায়ারের সুরে ‘মাঙ্গ কে সাথ তুমহারা’, ‘আইয়ে মেহেরবান’, ‘ইয়ে হ্যায় বম্বে মেরি জান’ তাঁকে ‘ক্যাবারে কুইন’ বানায়। ৭০-৮০ দশকে স্বামী রাহুল দেব বর্মনের সঙ্গে জুটি বেঁধে ‘দম মারো দম’, ‘পিয়া তু আব তো আজা’, ‘চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে’, ‘মেরা কুছ সামান’ উপহার দেন।
গজল, কাওয়ালি, পপ, ফোক, ডিস্কো — ২০টিরও বেশি ভাষায় ১২ হাজারের বেশি গান রেকর্ড করেছেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বয় জর্জ, বয়জোন, মাইকেল স্টাইপের সঙ্গেও কাজ করেছেন। ২০২৩ সালে ৯০ বছর বয়সেও দুবাইয়ে লাইভ কনসার্ট করেছেন।
*পুরস্কার ও সম্মান: মুকুটে অসংখ্য পালক*
১. *দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার*: ২০০০ সালে, ভারতীয় সিনেমার সর্বোচ্চ সম্মান
২. *পদ্মবিভূষণ*: ২০০৮ সালে, ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান
৩. *জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার*: শ্রেষ্ঠ নারী প্লেব্যাক গায়িকা হিসেবে ২ বার
৪. *ফিল্মফেয়ার পুরস্কার*: ৭ বার জয়ী, ১৮ বার মনোনয়ন। পরে লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট নিয়ে প্রতিযোগিতা থেকে সরে দাঁড়ান
৫. *গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড*: ২০১১ সালে সবচেয়ে বেশি গান রেকর্ড করার জন্য স্বীকৃতি
৬. *গ্র্যামি মনোনয়ন*: ২ বার
*শেষ বিদায় ও শোকবার্তা*
ছেলে আনন্দ ভোঁসলে জানিয়েছেন, রবিবার সকালে লোয়ার প্যারেলের কাসা গ্র্যান্ডে শেষ শ্রদ্ধা জানানো যাবে। শেষকৃত্য আজ বিকেল ৪টায় শিবাজী পার্কে।
প্রয়াণের খবর ছড়িয়ে পড়তেই শোকস্তব্ধ গোটা দেশ।
*উল্লেখযোগ্য শোকবার্তা*:
- *প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী* X-এ লিখেছেন, “তাঁর অসাধারণ সঙ্গীত যাত্রা দশকের পর দশক আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে। তাঁর কণ্ঠে ছিল চিরন্তন দীপ্তি। আত্মা হোক বা প্রাণবন্ত কম্পোজিশন— সবেতেই তিনি অতুলনীয়”।
- *সঙ্গীতজগৎ*: এ. আর. রহমান, শ্রেয়া ঘোষাল, সোনু নিগম, শঙ্কর মহাদেবন সহ অগণিত শিল্পী সামাজিক মাধ্যমে শোক প্রকাশ করেছেন।
- *ক্রিকেট জগৎ*: ক্রিকেটপ্রেমী আশার প্রয়াণে শচীন টেন্ডুলকার ও ব্রেট লি শোক জানিয়েছেন। ব্রেট লি ২০০৭ সালে তাঁর সঙ্গে ‘You’re the One for Me’ গান করেছিলেন।
*শিল্পী অমর রহে*
আশা ভোঁসলে শুধু গায়িকা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটা প্রতিষ্ঠান। লতা মঙ্গেশকরের ছায়া থেকে বেরিয়ে নিজের আলাদা সাম্রাজ্য গড়া, পুরুষতান্ত্রিক ইন্ডাস্ট্রিতে সাহসী গান গাওয়া, ৯০ বছর বয়সেও মঞ্চ কাঁপানো — সবেতেই তিনি বিদ্রোহী, তিনি অনন্যা।
‘পিয়া তু’, ‘দম মারো দম’, ‘চুরা লিয়া’, ‘দিল চিজ ক্যায়া হ্যায়’ — এই গানগুলো যতদিন বাজবে, যতদিন কোনো নায়িকা পর্দায় ঠোঁট মেলাবে, যতদিন কোনো কিশোরী আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর গান গাইবে — আশা ভোঁসলে ততদিন অমর হয়ে থাকবেন।
কারণ কিছু কণ্ঠ মৃত্যুর পরেও থামে না। তারা সময়কে ছাপিয়ে যায়। আশা ভোঁসলে তেমনই এক নাম। একটা যুগ। একটা আবেগ।
বিদায় সুরসম্রাজ্ঞী। আপনার ‘মেরা কুছ সামান’ ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা আমাদের নেই। শুধু চোখের জলে বলতে পারি — আপনি ছিলেন, আপনি আছেন, আপনি থাকবেন।
চেয়ারম্যান: নাজমুল হক ভূইয়া
সম্পাদক: মোঃ গোলাম রাব্বানী, প্রকাশক: শাহীনুর আক্তার
সম্পাদকীয় বার্তা কার্যালয়:
৬৫৭, হাজী সলিমুল্লাহ রোড, নামা শ্যামপুর,
ফরিদাবাদ, কদমতলী, ঢাকা-১২০৪।
স্বত্ব © ২০২৬ লোকালয় বার্তা