বুধবার, ২২ মে ২০২৪

বৈশাখী গল্প

লেখক কবি মুকলেছ উদ্দিন,

বৈশাখ
সম্মানিত বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-স্বজন যত কবি লেখক প্রবন্ধক গবেষক
আসসালামু আলাইকুম,
আপনাদের সবাইকে জানাই বৈশাখের সোনালী অভিনন্দন। গত কয়েকদিন আগে মামার বাড়ি কাইকুরিয়া গ্রামে গিয়েছিলাম বৈশাখী হাওয়া অনুধাবণ করার জন্য। যেখানে আমার জন্ম থেকে ২২ টি বছর কাটিয়েছি। দেখলাম বৈশাখ ঠিকই আসছে কিন্তু আমাদের হাওর এলাকায় পূর্বের বৈশাখ আর বর্তমান বৈশাখ অনেক পার্থক্য আজ। বৈশাখ হলো ভাটির হাওর এলাকার সবচেয়ে বোর ধানের মৌসুম, যার নাম হলো বোর মৌসুম। পূর্বে ধান কাটার জন্য দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নৌকা যুগে বা স্থলপথে অনেক ধান কাটার কামলা আসতো তাদেরকে বলা হতো ভাগালো। প্রচন্ড খরার মাঝে তারা মাতলা মাথে দিয়ে ধান কেটে মাথায় বোঝা বয়ে সমতল জায়গায় নিয়ে আসত। সেই জায়গায় গরু মহিষ দিয়ে ধান মাড়াই করার পর গরুর গাড়ি দিয়ে বস্থায় ভর্তি করে ধান বাড়িতে নিয়ে আসতাম। মাড়াই করা দান গরুর গাড়িতে বস্তা ভরে যখন বাড়িতে আনতাম রাস্তায় কামলাকে বলে কয়ে গাড়ী থেকে বস্তা চুরি করে অন্যের বাড়িতে নিয়ে যেতাম। আমাদের পকেট খরচের জন্য। এসময় কৃষক/ জোতদার দের মনে থাকত প্রচুর আনন্দ মালিক কামলা উভয়ই হাওরের হিজল গাছের নিচে প্রচন্ড রোদে কাজের ফাকেঁ গামছা পেতে ঘুমাত। যেখানে ধান মাড়ানো হত সেখানে রসগোল্লা, জিলাপি, গজা, বাতাশা,কলা, ইত্যাদি বেচাকেনার ধুম পরে যেত। বাড়ি থেকে কলসি ভরে মাখন পানি নিয়ে যেতাম কারণ মাড়াই করার খলা ছিল বাড়ি থেকে অনেক দূরে কোন কোন সময় কলসির মাখন পানি ফুরিয়ে গেলে। তখন নানা মামাকে বলতাম পানি দাও পানি খাব। তখন মামা একটি ধান গাছের ডেঙ্গা নিয়ে গিটা ফেলে দিয়ে একটা পাইপ বানিয়ে দিয়ে বলতো। যাও বিলে যাও। মামাকে বলতাম মামা বিলেতো পানি নেই। তখন মামা বলতো দেখো বিলের তলা ফেটে গেছে সেই ফাটার ভিতর বৃষ্টির পানি জমে আছে এই পাইপ দিয়ে পানি খেয়ে আসো। তখন সেখানে গিয়ে দেখি পাটার মধ্যে পানি রয়েছে। সেই ডেঙ্গার পাইপ দিয়ে পানি খেয়ে তৃষ্ণা মিটিয়েছি। আর কোন কোন সময় চাইল্যা খেতে গিয়েছি। সেখানে পেয়েছি অতিথি পাখির ডিম। হিজল তলায় গামছা বিচিয়ে শুয়ে থাকতাম প্রচন্ড রোদের আড়ালে হিজলের ছায়ায়। এখন আর সেই পরিবেশ নেই, হাওরে গাছ বলতে আর দেখা যায় না। নেই প্রতিদিন দোকানদার ভার কাঁদে নিয়ে আসত কলা জিলিপি গজা খাজা। তখন দোকানদারকে দিতাম কলই ভরে ধান কোন মাপ ছিল না এক কেজি জিলাপি এক কল‌ই ধান এক কলই ধান পরিমাণ 15 কেজি। এখন আর সেই দিন নাই এই বৈশাখে ভাগালোরা যখন আসতো তখন তারা সঙ্গে নিয়ে আসতো খেজুর গুড় হাড়ি ভরে। আন্ত নৌকা বুঝাই করে আলু সেই আলু বিক্রি করত ধানে এক পাল্লা ধান দের পাল্লা দুই পাল্লা আলু। নৌকা ভরে সেই বৈশাখে নিয়ে এসেছে পাতিল ওয়ালারা পাতিল কলসি মটকা শানকী। এই মাটির শানকিতেও আমরা ভাত খেয়েছি। আমাদের মা চাচীরা ধান বাতাসে উড়িয়ে ধানের যে চুচা ফেলে দিয়েছে সেই চুচা গুলির বিনিময়ে হাড়ি পাতিল রাখত। সেই চুচা পাতিল ওয়ালা বাতাসে উড়িয়ে ধান বাহির করে। নৌকা ভরে তাদের দেশে নিয়ে যেত ।সেই বৈশাখের মিষ্টান্ন সামগ্রীর সেই দোকান আর নেই ধান কাটার কামলা ভাগালোরা ও আর আমাদের দেশে আসেনা। গরুর গাড়ির প্রচলন ও আর নেই। বদলে গেছে সব এসে গেছে বৈদ্যুতিক যন্ত্র চালিত ধান কাটার মেশিন মাড়াই করার বোমা মেশিন । নসিমন, টমটম, বা ট্রোলি ইত্যাদি। জোতদারদের জোত নাই, তবে বৈশাখ আছে কিন্তু আগের বৈশাখের রুপ নাই, বদলে গেছে সব।
জানিনা এই পরিবর্তনের ঠিকানা কোথায়।
(২০)

থেকে আরও পড়ুন

থেকে আরও পড়ুন