সোমবার, ২০ মে ২০২৪

তেতুলিয়ায় শালবাহান হাটে গলাকাটা অতিরিক্ত টোল আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীসহ ব্যবসাহীদের

খাদেমুল ইসলাম
পঞ্চগড় জেলা প্রতিনিধি

পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়ায় উপজেলার শালবাহান হাটে দীর্ঘদিন ধরে গলাকাটা টোল আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীসহ স্থানীয়দের। হাটে উপজেলার কৃষক ও গৃহস্থরা উৎপাদিত খাদ্যশস্যসহ বিভিন্ন মালামাল বিক্রি করতে গিয়ে সরকার নির্ধারিত টোলের চেয়ে প্রায় চারগুণ অতিরিক্ত অর্থ দিতে বধ্য হচ্ছেন। এতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন হাটের ক্রেতা-বিক্রেতারা। এছাড়া টোল আদায়কারী কর্মীদের অসদাচরণের শিকার হয়ে হাট-বিমুখ হচ্ছেন হাটুরেরা। গত বুধবার ২৪ এপ্রিল
বিকালে উপজেলা সহকারী ভুমি কমিশনার মাহমুদুল হাসান, ইউএনও অফিসের সিএ কবির হোসেন ও শালবাহান চেয়ারম্যান মো. আশরাফুল ইসলাম হাটের বিভিন্ন বাজার পরিদর্শন করে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সরকার নির্ধারিত হারের চেয়ে অতিরিক্ত টোল পরিশোধ করতে নিষেধ করেছেন এবং হাট ইজারাদারকে ডেকে নিয়ে সতর্ক করেছেন। সরেজমিন জানা যায়, উপজেলা শালবাহান
হাটে প্রায় ৫/৬ হাজার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। উপজেলার ঐতিহ্যবাহী এ হাটে কোথাও টোলের তালিকা প্রদর্শন করা হয়নি। হাটের মূল ইজারাদার প্রতিটি পণ্যের বাজার পৃথকভাবে সাব-লিজ প্রদান করেছেন। সাব-লিজ গ্রহীতারা পৃথক পণ্যের বাজারে টোল আদায়ের জন্য বিভিন্ন লোক নিয়োগ দিয়েছেন। তারা সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে নিজেদের মনগড়া হারে টোল আদায় করে চলেছেন। হাটের পেঁয়াজ, রসুন, আলু সুপারী,ও মরিচ বাজারে কুইন্টাল প্রতি সরকার নির্ধারিত ১৬ টাকার স্থলে টোল আদায় করা হচ্ছে ৬০ টাকা, ধানের চারা বস্তাপ্রতি ১০ টাকার স্থলে আদায় হচ্ছে ৮০ টাকা, সবজি কুইন্টাল প্রতি ৮ টাকার স্থলে গৃহস্থ মাত্র একটি লাউ বিক্রি করেও টোল দিতে বাধ্য হচ্ছেন ১০ টাকা, বাজারের কৃষকরা কিছু সুপারী
বিক্রি করলেও প্রতিজনকে টোল দিতে হচ্ছে ১০০ টাকা, খেজুর গুড় বিক্রেতাকে টোল দিতে হচ্ছে ১৫০ টাকা, পশুহাটে মুরগিতে টোল শতকরা ১০ টাকা, ছাগলের টোল হাজারে ১০০ টাকা, গরুতে হাজারে ৫০ টাকা, ফুটপাতের দোকানে শুধু চট বিছানোর জন্য ২০ টাকা ছাড়াও পৃথকভাবে পণ্যের টোল আদায় হচ্ছে। এছাড়া ক্রেতা ও বিক্রেতা দুজনের কাছ থেকে আমদানি-রপ্তানি খাজনার অজুহাত দিয়ে প্রতিটি বিক্রিত পণ্যের বিপরীতে দুই দফায় টোল আদায় করা হচ্ছে।একই সঙ্গে হাটে পণ্য বহনকারী প্রতিটি গাড়ি থেকে ২০০ টাকা হারে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে বলেও ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন।এ ব্যাপারে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও হাট ইজারাদার মো. রফিকুল ইসলাম
জানান, ‘হাটে বিগত বছরগুলোতে যে হারে টোল আদায় করা হয়েছে আমি তার বেশি আদায় করি না। আমি হাট ইজারা নেওয়ার পর বিভিন্ন পণ্যের হাট সাবলিজ দিয়েছি, তাই অতিরিক্ত টোল আদায় বা গাড়িপ্রতি চাঁদা আদায়ের বিষয়গুলো আমার জানা নেই।’
।এ ব্যাপারে হাট ইজারাদার মো. রফিকুল ইসলাম
জানান, ‘হাটে বিগত বছরগুলোতে যে হারে টোল আদায় করা হয়েছে আমি তার বেশি আদায় করি না। আমি হাট ইজারা নেওয়ার পর বিভিন্ন পণ্যের হাট সাবলিজ দিয়েছি, তাই অতিরিক্ত টোল আদায় বা গাড়িপ্রতি চাঁদা আদায়ের বিষয়গুলো আমার জানা নেই।’

এব্যাপারে শালবাহান হাটে মরিচ ব্যবসাহী মোঃ ইব্রাহিম খলিল,আব্দুল বারেক এবং রওশনপুর গ্রামের মরিচ চাষি আবু তালেব বলেন, ‘একটি মরিচের গাছের পেছনে খরচ পড়ে ১৫ থেকে ২০ টাকা। তারপর প্রতি কেজিতে গান্ডি দিতে হয় ৫ টাকা। ব্যবসায়ীরা প্রতিমণে অতিরিক্ত নেয় ১ কেজি। তাহলে আমরা যাব কোথায়। আমাদের তো লোকসান হচ্ছে। এই রোদে পুড়ে মরিচ চাষ করে কী লাভ হলো। সার কিটনাশক, শ্রমিকের মজুরি সব বেড়ে গেছে। আজ মরিচ বিক্রি করতে পারলাম না। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আমরা মাঠে মারা যাব।’

ব্যবসায়ীরা বলছেন, জেলা প্রশাসন থেকে ২০২৩ -২০২৪ অর্থবছরে কৃষকদের বাজারে মরিচ ও সুপারি বিক্রয়ে ইউনিয়ন পরিষদে দেয়ার জন্য খাজনা নির্ধারণ করে দেয় কেজি প্রতি ৩ টাকা। কিন্তু জেলা প্রশাসনের সিদ্ধান্তকে তোয়াক্কা না করে একতরফা ভাবে ২ টাকা বাড়িয়ে ৫ টাকা খাজনা আদায় করছে।

মরিচ ব্যবসায়ী আমজাদ হোসেন জানান, অন্য কোনো হাটে এত বেশি খাজনা আদায় করা হয় না। আগে আমরা ট্রাক প্রতি ২শ’ টাকা খাজনা দিতাম। এখন এখন প্রতি ট্রাকে ৬ হাজার টাকা খাজনা দিতে হবে। এতে করে আমরা তো লাভ করতে পারব না। তাই মরিচ কেনা বন্ধ করেছি। এদিকে অতিরিক্ত এক কেজি মরিচ নেয়ার বিষয়টি জানতে গেলে তিনি আরও বলেন, সব হাটেই চাষিদের কাছ থেকে মণ প্রতি অতিরিক্ত ১ কেজি করে নেয়া হয়। কারণ অনেক সময় তারা পঁচা মরিচ দেয়।
শালবাহান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘খাজনার পরিমাণ বেশি হয়েছে। এ অভিযোগ ব্যবসায়ীরা এখনও করেনি। তারা বললে ব্যবস্থা নেব। কিন্তু চাষিদের কাছ থেকে তারা প্রতি মণে অতিরিক্ত ১ কেজি করে বেশি নিচ্ছে এমন অভিযোগ আমরা পেয়েছি।’এদিকে হাটের এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির খবর পেয়ে বাজার পর্যবেক্ষণ করার জন্য শালবাহান হাট পরিদর্শন করেছেন তেঁতুলিয়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহবুবুল হাসান ।

তিনি বলেন, কর্তৃপক্ষ সম্ভবত ভুল করে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিষয়টি পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। আপাতত আগের নির্ধারিত খাজনাই আদায় করার ইউনিয়ন পরিষদকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

থেকে আরও পড়ুন

থেকে আরও পড়ুন